আলিমুদ্দিন আরজেরনেছা পাবলিক হাই স্কুল

কৃষ্ণপুরের প্রথম সাধারণ হাইস্কুল পর্যায়ের শিক্ষার জন্য প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানটির নাম ছিলো কৃষ্ণপুর এওয়াইসি হাই স্কুল। 'এ' দিয়ে আলী আকবর, 'ওয়াই' দিয়ে ইয়াকুব আলী এবং 'সি' দিয়ে চেরাগ আলীর নাম বোঝানো হতো। নিশ্চিতভাবে জানা না গেলেও ধারণা করা হয় যে এর সূচনাটি বিগত শতকের চল্লিশের দশকে হয়। স্কুলটি প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে সবচেয়ে বেশি কার্যকর ভূমিকা পালন করেন মরহুম মাস্টার শহীদুল ইসলাম। তিনি মরহুম আলী আকবর সাহেবের বড় মেয়ের জামাই ছিলেন। কথিত আছে যে, তিনি আলী আকবর সাহেবের মেয়েকে বিয়ে করার আগে যৌতুক হিসেবে একটি স্কুল প্রতিষ্ঠা করার দাবী জানান। এর দাতাদের নামেই স্কুলটি স্থাপিত হয়। তবে এর পরিচালনার দায়িত্ব ছিল মোস্তাফা জব্বারের পিতা আব্দুল জব্বার তালুকদার সাহেবের উপর। তিনি বর্তমান ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার আশগঞ্জ থানার চর চারতলা গ্রামের অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তা কুদ্দুস দারোগাকে হেড মাষ্টার হিসেবে নিয়োগ দেন। এই প্রতিষ্ঠানে নরসিংদীর শাহাবুদ্দিন মাষ্টার এবং শাল্লা থানার মুক্তারপুর গ্রামের হরকুমার বাবু শিক্ষকতা করেছেন। কিন্তু শিক্ষক না পাওয়া, শিক্ষকদের বেতন নিয়মিত দিতে না পারা ও ছাত্রের অভাবে স্কুলটি বন্ধ হয়ে যায়। স্কুলটি সম্ভবত ১৯৫০ সাল পর্যন্ত চালু ছিল।

এওয়াইসি স্কুলটি বন্ধ হবার প্রায় ১৯ বছর পর মোস্তাফা জব্বারের বাড়ির বিলুপ্ত আমগাছ তলায় (যেখানে গ্রামের প্রথম মক্তবটি আলিমুদ্দিন শেখ প্রতিষ্ঠা করেন) বসে মোস্তাফা জব্বার, আবিদ মাষ্টার, আবুল কাশেম, আব্দুল হান্নান মাষ্টার কৃষ্ণপুর গ্রামে একটি হাইস্কুল স্থাপনের বিষয়ে উদ্যোগ নেবার সিদ্ধান্ত নেন। তখন তারা সবাই ছাত্র। সেজন্যই স্কুলটি স্থাপনের জন্য একজন অভিভাবকের সন্ধানে তারা গ্রামের অন্যতম শিক্ষানুরাগী ও প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক শহীদুল ইসলামের (আছমত মাষ্টার নামে পরিচিত এবং এ ওয়াইসি হাইস্কুলের উদ্যেক্তা) কাছে গেলে তিনি সহযোগিতার আশ্বাস দেন। পরে পীর আব্দুল জব্বার তালুকদার সাহেবকে জানানো হলে তিনি প্রস্তাব গ্রহণ করেন। তিনি বলেন যে, তিনি স্কুলের যাবতীয় জমি, আসবাব পত্র দেয়ার কথা দেন। তিনি বলেন তোরা মাষ্টারি করে স্কুল চালাবি।

প্রথমত ক্লাস শুরু হয় প্রাইমারী স্কুলের একটি ঘরে যা মাষ্টার শহীদুল ইসলাম দান করেন। মাত্র ৬ জন ছাত্র নিয়ে ক্লাস সিক্স চালু হয়। স্কুল চলতো বিনা বেতনে। মাস্টার আবিদউদ্দিন বিনা বেতনে স্কুলের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করেন। আব্দুল হান্নান মাস্টারও স্কুলে শিক্ষকতা করতেন বিনা বেতনে। স্কুল চালুর পরের বছর ১৯৭০ সালে কিছু নতুন ছাত্র ভর্তি হল। তখন পীর আব্দুল জব্বার তালুকদার বর্তমান প্রাইমারী স্কুলের স্থানে মাটি ভরাট করে দেন। পরে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেন গজেন্দ্র চন্দ্র সরকার (চানপুর), সুনীল চন্দ্র সরকারকে (পোড়ার পাড়)। নতুন ছাত্র ভর্তি হলে ক্লাস ৬,৭,৮ চালু হয়। তখন ছাত্র প্রায় ৪০ জন। ১৯৭০ এর আগষ্টে ভারপ্রাপ্ত হেড মাষ্টার আবিদ মাষ্টার স্কুল ছেড়ে চলে গেলেন। স্কুল চললো নতুন হেড মাষ্টার হান্নান সাহেবের নেতৃত্বে।

১৯৭১ সালের মার্চ মাসে যুদ্ধ শুরু হলে স্কুলের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। স্কুলের শিক্ষক গজেন্দ্র বাবু মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন। মুক্তিযুদ্ধের পরে ১৯৭২ সালে পীর আব্দুল জব্বার তালুকদার সাহেবের নেতৃত্বে স্কুল পুনরায় চালু হয়। তিনি তখন ছিলেন থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি। তখন একটি স্কুল পরিচালনা কমিটি গঠিত হলে তিনি সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব প্রাপ্ত ছিলেন। সদস্য হিসেবে ছিলেন আবিদ মাষ্টার, রাকেশ রঞ্জন, আনোয়ার আলী, আব্দুল হাশিম প্রমুখ। ১৯৭২ সালে স্কুলটি বর্তমান স্কুলের স্থানে স্থানান্তর করা হয় এবং নামকরণ করা হয় কৃষ্ণপুর আলিমুদ্দিন আরজেরনেছা পাবলিক উচ্চ বিদ্যালয়। আলিমুদ্দিনের নাম যুক্ত হয় প্রতিষ্ঠাতা আব্দুল জব্বারের ইচ্ছায়। আরজের নেছা হলেন আলিমুদ্দিনের বড়পুত্রের বৌ। তার নাম যুক্ত হয় আরজেরনেছার পুত্র ও আলিমুদ্দিনের নাতি ডাঃ নিয়াজ মোহাম্মদ তালুকদারের ইচ্ছায়। তিনি স্কুলকে ৭ কানি (২৮০ শতাংশ) জমি দান করেন। তখন প্রথম এম.এ. পাশ হেড মাষ্টার নিয়োগ পান আবুল কাশেম আজাদ আকবারী। বছর দুয়েক পরে তিনি দায়িত্ব ছেড়ে দিলে একে একে নিয়োগ পান প্রিয়েস চৌধুরী (শিলুন্দা), আলী আকবর (বারহাট্টা), কিবরিয়া জব্বার ও নিরঞ্জন বাবু। বর্তমানে স্কুলের প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন গ্রামেরই ছেলে জামাল উদ্দিন। ১৯৯৬ সাল থেকে স্কুলটিতে ছাত্রী ভর্তি করা হয়না। প্রধানত গ্রামের বালিকা বিদ্যালয়টিকে সমর্থন দানের জন্যই এই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। স্কুলটির বর্তমান পাশের হার শতকরা ৮০ ভাগের ওপরে। মোস্তাফা জব্বারের ছোট ভাই ও খালিয়াজুরী উপজেলা চেয়ারম্যান জনাব কিবরিয়া জব্বার স্কুলটির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন দীর্ঘদিন থেকে।